জাক দেরিদার টেক্সচুয়ালিটি: একটি বাংলা অনুবাদ
প্রদত্ত পাঠ্যটি জাক দেরিদার দর্শনের একটি মূল ধারণা ব্যাখ্যা করে, যা মূলত তাঁর ডিকনস্ট্রাকশন এবং পাঠ্যের প্রকৃতি সম্পর্কিত ধারণার উপর কেন্দ্র করে।
উৎস ও পুনরাবৃত্তি (Origin and Repetition)
দেরিদা পাঠ্যের উৎস থেকে তার স্বাধীনতা দিয়ে শুরু করেন। "দেরিদার মতে, কোনো পাঠ্যকে তার উৎস (লেখক, সমাজ, ইতিহাস বা প্রেক্ষাপট) দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ পুনরাবৃত্তিই (repetition) তার উৎসে থাকে।" এটি দেরিদার একটি মৌলিক দাবি।
প্রচলিত সাহিত্য সমালোচনার বিপরীতে, যেখানে একটি পাঠ্যকে লেখকের উদ্দেশ্য, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বা সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়, দেরিদা যুক্তি দেন যে পাঠ্যটি কেবল এই উৎসগুলোর একটি পণ্য নয়। এখানে "পুনরাবৃত্তিই তার উৎসে থাকে" কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো, অর্থ কোনো একক বা নির্দিষ্ট সৃষ্টি থেকে স্থির হয় না, বরং ভাষার মধ্যে বারবার পুনরাবৃত্তি, ব্যাখ্যা এবং পার্থক্যের মধ্য দিয়ে তা উঠে আসে। "উৎস" কোনো স্থিতিশীল, মৌলিক বিন্দু নয়, বরং এটি একটি গতিশীল পুনরাবৃত্তির প্রক্রিয়া।
লেখা ও অনিচ্ছাকৃত ভাষা (Writing and Unintentional Language)
"পাঠ্য হলো লিখন এবং লিখন হলো অনিচ্ছাকৃত ভাষা।" এটি দেরিদার লিখনকে কথ্য ভাষা থেকে আলাদা করার ওপর জোর দেয়। কথ্য ভাষাকে প্রায়শই তাৎক্ষণিক, বর্তমান এবং বক্তার সচেতন উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। কিন্তু "অনিচ্ছাকৃত ভাষা" হিসেবে লিখন নিজেকে লেখকের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়। একবার লেখা হয়ে গেলে, এটি অসংখ্য উপায়ে পড়া ও ব্যাখ্যা করা যায়, যা লেখকের সচেতন উদ্দেশ্যের বাইরেও হতে পারে। এটি এই অর্থে "অনিচ্ছাকৃত" যে এর অর্থ কেবল লেখকের প্রাথমিক ইচ্ছার দ্বারা নির্ধারিত হয় না।
"এটি কথ্য ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ভাষা যা একে বাস্তবায়িত করে।" এটি বোঝায় যে লেখার একটি নির্দিষ্ট স্বায়ত্তশাসন থাকলেও, এটি ভাষার বৃহত্তর ব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান, যার মধ্যে কথ্য ভাষা অন্তর্ভুক্ত। লিখন ভাষার সেই দিকগুলোকে "বাস্তবায়িত" করে যা কথ্য ভাষাতেও উপস্থিত থাকতে পারে, তবে এটি এমনভাবে করে যা অর্থের ভিন্ন ধরনের খেলা এবং স্থগিতকরণের সুযোগ দেয়।
পাঠের প্রয়োজনীয়তা (The Necessity of Reading)
লেখক পরবর্তী বক্তব্যে পড়ার প্রয়োজনীয়তার বিকাশ ঘটান: "তবে, কেবল পড়াই পাঠ্য ও লিখনকে সম্ভব করে তোলে।" এটি পাঠ্যের স্বাধীনতার ধারণাকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে। যদিও পাঠ্য তার উৎস দ্বারা সম্পূর্ণ আবদ্ধ নয়, তবুও এর অর্থের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য একজন পাঠকের প্রয়োজন হয়। পড়া কোনো নিষ্ক্রিয় গ্রহণ নয়, বরং একটি সক্রিয় অংশগ্রহণ যা পাঠ্যকে একটি অর্থপূর্ণ সত্তা হিসেবে অস্তিত্বে নিয়ে আসে।
পাঠ্যতা: সমাপ্তি ও অ-সমাপ্তি (Textuality: Closure and Non-Closure)
"যা লিখনকে বৈশিষ্ট্য দেয় তা হলো পাঠ্যতা (textuality), যা একই সঙ্গে পাঠ্যের সমাপ্তি এবং অ-সমাপ্তি।" এই বাক্যটি পাঠ্যের আক্ষরিক অর্থ এবং এর সর্বদা পরিবর্তনশীল নিহিত অর্থের বিষয়ে লেখকের ধারণা বোঝায়। "পাঠ্যতা" হলো একটি পাঠ্যের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য।
"সমাপ্তি" বোঝায় যে একটি পাঠ্যের একটি নির্দিষ্ট রূপ আছে, একটি শুরু এবং শেষ আছে (শারীরিকভাবে), এবং একটি অভ্যন্তরীণ সংহতি আছে যা এটিকে একটি স্বতন্ত্র একক হিসেবে উপলব্ধি করতে দেয়।
অন্যদিকে, "অ-সমাপ্তি" বোঝায় যে এর আপাত সীমানা থাকা সত্ত্বেও, একটি পাঠ্যের অর্থ কখনোই চূড়ান্তভাবে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সর্বদা নতুন ব্যাখ্যা, আন্তঃপাঠ্য সংযোগ এবং অর্থের স্থগিতকরণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। এই "অ-সমাপ্তি"ই ডিকনস্ট্রাকশনকে ঘটার সুযোগ দেয়, কারণ এটি অর্থের অন্তর্নিহিত অস্থিরতা এবং বহুগুণকে প্রকাশ করে।
দেরিদা তাঁর মহাকাব্য "রাইটিং অ্যান্ড ডিফারেন্স"-এ বলেন, "যার কোনো শেষ নেই তার সমাপ্তি কল্পনা করা যায়। সমাপ্তি হলো সেই বৃত্তাকার সীমা যার মধ্যে পার্থক্যের পুনরাবৃত্তি অসীমভাবে পুনরাবৃত্ত হয়। অর্থাৎ, সমাপ্তি হলো তার খেলার জায়গা। এই গতিবিধি হলো খেলা হিসেবে বিশ্বের গতিবিধি।"
এই উক্তিটি দেরিদার কাছে পাঠ্যতা এবং অর্থের পরস্পরবিরোধী প্রকৃতিকে ধারণ করে।
* "যার কোনো শেষ নেই তার সমাপ্তি": এর অর্থ হলো, যদিও অর্থ কখনোই সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয় না ("যার কোনো শেষ নেই"), তবুও আমরা যেকোনো মুহূর্তে একটি পাঠ্যের উপর এক ধরনের "সমাপ্তি" বা উপলব্ধি আরোপ করি। এই সমাপ্তি অস্থায়ী এবং সর্বদা পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার যোগ্য।
* "বৃত্তাকার সীমা যার মধ্যে পার্থক্যের পুনরাবৃত্তি অসীমভাবে পুনরাবৃত্ত হয়": এটি "ডিফাঁস" (différance) এর অবিরাম খেলাকে নির্দেশ করে, যা দেরিদার একটি নতুন শব্দ (neologism), যেখানে "পার্থক্য" (to differ) এবং "স্থগিত" (to defer) করা একত্রিত হয়েছে। অর্থ ক্রমাগত অন্য অর্থ থেকে পার্থক্য সৃষ্টি করছে এবং স্থগিত হচ্ছে, কখনোই একটি স্থির অবস্থায় স্থির হচ্ছে না। এই পুনরাবৃত্তি কেবল একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং এমন একটি পুনরাবৃত্তি যা সর্বদা পার্থক্যকে অন্তর্ভুক্ত করে।
* "সমাপ্তি হলো তার খেলার জায়গা": একটি পাঠ্য বা ধারণার আপাত "সমাপ্তি" কোনো কঠোর সীমানা নয়, বরং সেই স্থান যেখানে অর্থ এবং পার্থক্যের অবিরাম খেলা ঘটতে পারে।
জীবন ও জগৎ (Life and the World)
সবশেষে, একটি ধারণার সাধারণীকরণ করে বলা হয়: "এই গতিবিধি হলো খেলা হিসেবে বিশ্বের গতিবিধি।" দেরিদা এই ধারণাটিকে কেবল পাঠ্যের বাইরেও প্রসারিত করেন, এবং বোঝান যে বাস্তবতা এবং সে সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিও পার্থক্য, স্থগিতকরণ এবং অন্তর্নিহিত অস্থিরতার এই ধ্রুবক পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপ দ্বারা চিহ্নিত হয় - যা একটি স্থির, মৌলিক সত্যের পরিবর্তে এক ধরনের "খেলা"।
দেরিদার ধারণা একটি পাঠ্যকে লেখকের উদ্দেশ্য প্রকাশের একটি স্থিতিশীল মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। পরিবর্তে, তিনি এটিকে একটি গতিশীল, উন্মুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেন যেখানে অর্থ অবিরাম গতিশীল, যা ভাষা, পড়া এবং অন্তর্নিহিত "diffrance"-এর পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপ দ্বারা গঠিত, যা কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি বা নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে বাধা দেয়।
Comments
Post a Comment